ভারতীয় মিডিয়ায় চট্টগ্রাম দখল ঘোষণার নেপথ্যে : ইবনে শাহ

প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২৪

ইবনে শাহ, ঢাকা : ৩৬ শে জুলাই এর পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। উস্কানিমূলক সংবাদ প্রচারসহ আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে বারবার চট্টগ্রাম দখলে নেয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন একটি মিডিয়ার বিচ্ছিন্ন কোন ঘোষণা নয়, ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়া ধারাবাহিকভাবে এ ঘোষণা উচ্চারণ করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকার এ ব্যাপারে একদম চুপ, কোন প্রতিবাদ করছে না। নেপথ্যে কারণ কি ?

অথচ ১৯৮৫ সালের ১২ এপ্রিলের ঘটনা মনে করে দেখুন। এদিন ভারতের দুইজন উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী নাগরিক পদ্মপল চোপরা ও শীতল সিং আল কুরআনের সকল আরবি কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে একটি রীট আবেদন করে। রীটে বলা হয়, কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যেখানে কাফির ও মুশরিকদের হত্যা এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দেয়া হয়েছে, সেহেতু কুরআন একটি সাম্প্রদায়িক উস্কানী দাতা গ্রন্থ, তাই একে বাজেয়াপ্ত করার দাবি তুলে মামলা দায়ের করে। ভারতীয় সংবিধানের ২২৩ নং ধারা সি আর পিসি ১১৫(ক) ও ২৯৫ (ক) উদ্ধৃতি দিয়ে তারা আল কুরআনকে ভারতীয় সংবিধান বিরোধী বলে উল্লেখ করে। বিচারপতি মিসেস পদ্মা খাস্তগীর মামলা গ্রহণ করেন এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে এফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় ভারতীয় মুসলিমসহ বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এর প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। ভারতীয় হাইকোর্টে কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ১৯৮৫ সালের ১১ইমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঈদগাহ ময়দানে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসন কর্তৃক ভারতীয় হাইকোর্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে বাধা প্রদান করা হয়, তৌহিদী জনতা বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশ করতে চাইলে ইসলামবিদ্বেষী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান পুলিশকে গুলির নির্দেশ দেয়, ফলে সংঘটিত হয় এক পৈশাচিক হত্যাকান্ড। ঐস্থানে পুলিশের গুলিতে আটজন কুরআন প্রেমিক শাহাদাতবরণ করেন। প্রশ্ন আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসলামবিদ্বেষী মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান কোন আইনের দোহাই দিয়ে তৌহিদি ছাত্র জনতার বুকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল।

জেলা মেজিস্ট্রেট আন্তর্জাতিক চুক্তি, কনভেনশন ও রেজুলেশনের লঙ্ঘনের দোহাই দিয়েছিলো-
১. জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন—
জাতিসংঘ সনদের (UN Charter) ২(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “সব সদস্য রাষ্ট্র তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলিতে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি প্রদান করা থেকে বিরত থাকবে, যা অন্য কোনও রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যেতে পারে।”

২. সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার নীতি লঙ্ঘন–প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। যদি কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়, তাহলে সেটি সেই দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হয়। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি অনুযায়ী অবৈধ।

৩. অপপ্রচার এবং শান্তির বিঘ্ন ঘটানো—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৭০ সালের Declaration on Principles of International Law অনুসারে, প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য দায়িত্ব হল অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং অপপ্রচার না চালানো। অপপ্রচার চালানো হলে, সেটি ঐ দেশের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ হয় এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী কাজ।

৪. Friendly Relations Declaration, 1970–জাতিসংঘের এই ঘোষণায় বলা হয়েছে যে, সব রাষ্ট্রকে পরস্পরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা একটি মৌলিক আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

৫. আন্তর্জাতিক অপরাধ –যদি কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয় বা যুদ্ধের হুমকি দেয়, তাহলে সেটি Crimes Against Peace হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় পড়ে। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারের অধীন।

তাহলে এখন প্রশ্ন আসে, ভারতের হাইকোর্টে কুরআনের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে গেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাতিসংঘ সনদের ৩ নং ধারার দোহাই দিয়ে সমাবেশে গুলির নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া তিন মাস যাবত একের পর এক অপপ্রচার এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেওয়ার পরও ভারত সরকার চুপ কেন? কারণ হলো বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা নিজস্ব উদ্যোগে কুরআনের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। আর পশ্চিমবাংলার মিডিয়াগুলো তাদের সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে এসব অপপ্রচার ও চট্টগ্রাম দখলের হুমকি দিচ্ছে। এ কারণেই আগ্রাসনবাদী ভারতের সরকার বা প্রশাসন চুপচাপ বসে আছে, আর তলে তলে অবলোকন করছে – খোঁচা মেরে দেখি, কি বলে?

এত বড় ঘটনা আমরা হজম করছি। কারণ হলো এদেশের জনগণের চামড়া গন্ডারের চামড়ার মতো, এত মোটা চামড়া ভেদ করে ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদ মস্তিষ্কে পৌছিতে তিন মাস সময় তো লাগবে। সুখবর হলো আমাদের কিছু মিডিয়া এ বিষয়ে টকশোর আয়োজন করছে। বিবেকের তাড়নায় কিছু বুদ্ধিজীবী ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের মোকাবিলায় পাকিস্তান কিংবা চীনের মত পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সাথে আত্মরক্ষা মুলক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পক্ষে মতামত দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আত্মরক্ষামূলক চুক্তির কথা বললেও ভাসুরের নাম মুখে আনতে লজ্জা পাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ভাইকে ভাসুর বানালো কে তার দিকে কেউ আঙ্গুল তুলছে না।

বিগত তিন মাস ধরে ভারতীয় মিডিয়া ক্রমাগতভাবে এসব অপপ্রচার এবং হুমকি দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের দেশের জনমত গঠনের চেষ্টা করছে। কিন্তু আমারা এসব ঘোষণাকে থোরাই কেয়ার করছি। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের কোন প্রয়োজন অনুভব করছি না। এর প্রকৃত কারণ হলো সেই ১৯৭১ সাল থেকে ভারত তার আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য এদেশের অভ্যন্তরে অনেক মিডিয়া সৈনিক, রাজনৈতিক আদর্শের সৈনিক ও বেতনভুক্ত বুদ্ধিজীবী সৈনিক তৈরি করে রেখেছে। এর উপর আছে প্রশাসনের মদদপুষ্ট সেবাদাস। আমাদের দেশের অভ্যন্তরে এসব আধিপত্যবাদী সৈনিকেরা সীমান্তে ভারতীয় সৈনিকদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই এরা বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের মতো করে হত্যা করে, দৈনিক সংগ্রামের বয়োবৃদ্ধ সাংবাদিক আবুল আসাদ সাহেবের মতো করে গলা চেপে ধরে টেনে হিচড়ে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। এরা জুলাইয়ের ৩৬ দিন ধরে হাজার হাজার ছাত্র জনতাকে পঙ্গু ও অন্ধ করে দিয়েছে, শত শত ছাত্র জনতাকে হত্যা করেছে।

এদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের সৈনিকরা জনগণকে সর্বদাই উল্টো স্রোতে প্রবাহিত করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে নিচ্ছে। একচেটিয়া বাণিজ্য, স্থল ও রেলপথে করিডোর, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারসহ অনেক অবৈধ সুযোগ আদায় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে সীমান্তে হত্যাকান্ড, ভারতীয়দের এদেশে চাকরির সুযোগ ও অপসংস্কৃতিতে দেশ ভরিয়ে দিচ্ছে। তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের মতো অতি প্রয়োজনীয় প্রজেক্টগুলোতে ঝামেলা বাধিয়ে সময় পার করাচ্ছে। অপরদিকে তাদের প্রয়োজনে লাগবে এমন প্রজেক্ট যেমন পদ্মা সেতুতে রেল,এতে আমাদের যত‌ই ক্ষতি হোক দ্রুত বাস্তবায়ন চাচ্ছে। আর এসব অবৈধ চুক্তি না মানলে, কিংবা লঙ্ঘন করতে চাইলে দেশ দখলের হুমকি দিচ্ছে।

এসবের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। এটা কোন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের কাজ নয়। দেশের সকল জনগণকে নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আধিপত্যবাদী ভারতের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, এটা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এজন্য উপযুক্ত সহযোদ্ধা খুঁজে নিতে হবে। এজন্য আদর্শগত মিল আছে, যারা আমাদেরকে বন্ধু নয়, ভাই মনে করে এমন নিকটবর্তী ভাতৃ-প্রতিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সাথে আত্মরক্ষামূলক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে হবে। এদেশে পারমানবিক অস্ত্র মোতায়েন করে পূর্ব-পশ্চিমে প্রতিরোধ গড়ে তুললে আধিপত্যবাদী ভারতের অবস্থা হবে –“আর কিছুই চাইনা -ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি”! শুধু ভারত নয়, অন্যরাও আমাদেরকে সমীহ করে চলবে, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিরাপদ থাকবে।

সময়ের এক ফোড় অসময়ের নয় ফোড়ের সমান, জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময় ।

লেখক : ইবনে শাহ, ঢাকা ।